বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ০৫:২৬ পূর্বাহ্ন
Logo
নোটিস :
আমাদের সাইট-এ প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে,যোগাযোগ করুন>> 01712-129297>>>01712-613199>>>01926-659742>>>

“ অবধারিত ” সুলেখা আক্তার শান্তা

সুলেখা আক্তার শান্তাঃ / ১৯৮ বার
আপডেটে : রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

“ অবধারিত ”

ঘরে বিবাহযোগ্যা মেয়ে থাকলে পিতা-মাতার চিন্তা হয়। সন্তানের মঙ্গলের জন্য সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে সন্তানের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হয় না। বাবা-মা যা করে সন্তানের ভালোর জন্যই করেন। তাহেরা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলে। আমরা তো তোকে পানিতে ফেলছিনা! এখন দিনকাল যা পড়েছে। তাই মেয়েকে ভালোভাবে বিয়ে দিতে পারলে বাঁচি। ভাল পাত্র পাওয়া গেছে তাই তোর বাবা তোকে বিয়েতে রাজি হয়েছে। এমন পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না!
দোল মাকে বলে, মা আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা। আমি পড়ালেখা করতে চাই।
পড়ালেখা করে কি হবে? আমরা তো তোকে দিয়ে চাকরি করাবো না।
মা মেয়েরা পড়ালেখা করে এখন নিজের পায়ে দাঁড়ায়। কারো প্রতি নির্ভরশীল হয়না। আমার সঙ্গীরা পড়ালেখা করছে। তারা পড়ালেখা করে জীবনে একটা কিছু করতে চায়। আর তোমরা আছো আমার বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই? আমি সবে মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ি।
হয়েছে হয়েছে যা পড়েছিস তাতেই চলবে।
দোলা ভাবে তর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই। মা তোমাদের যা ইচ্ছা তোমরা তাই করো। এ বিষয় নিয়ে আমি আর কথা বলবো না।
বিয়ের ব্যাপারে মেয়ের অমত দেখে তাহেরা স্বামীর সঙ্গে কথা বলে। দোলার বাবা, তোমার মেয়ে তো বিয়েতে রাজি না।
আহাদ আহমেদ তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে। মেয়ের আবার মতামত কি? আমাদের সিদ্ধান্তেই ওর সিদ্ধান্ত। ছেলে বড় ব্যবসায়ী। টাকা-পয়সা আছে ভালো। মেয়ে আমার সুখে-শান্তিতে থাকবে।
দোলার বিয়ে হয় জাবেদের সঙ্গে। দোলা তার স্বামী দেখে অবাক। জাবেদের বয়স অনেক। ভাবে, আমার বাবা মার কাছে জাবেদ এতই সুপাত্র। যার কাছে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তাঁরা শান্তি পেল। যাক এই ছিল আমার কপালে। জাবেদ দোলাকে নিয়ে বাড়িতে উঠতেই হট্টগোল লেগে যায়।
জাবেদের প্রথম স্ত্রী তেড়ে এলো। ও শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে সতীনের ঘর করাবে? চোখের সামনে মেয়ে মানুষ নিয়ে রঙ ঢং করো তাও সহ্য করি। এখন নিয়ে এসেছো বিয়ে করে! এ কথা শুনে হতভম্ব হয়ে পড়ে দোলা। ক্ষোভে দুঃখে মর্মযাতনায় বুক ফেটে যায় তার। এমন পরিস্থিতিতে ভাগ্যের হাতে নিয়তি তুলে দেওয়া ছড়া উপায় থাকেনা। প্রচন্ড অভিমানে সিদ্ধান্ত নেয় বাবা-মার ভালো পাত্র সঙ্গেই সংসার করবে সে। আমার কপালে যা লেখা আছে তাই হবে।
জাবেদ স্ত্রী দোলাকে বলে, তুমি এতো ভাবছো কেন? আমি তো বিয়ে করে কাউকে ভাত-কাপড়ের কষ্ট দিইনি!
দোলা স্বামীর উদ্দেশ্যে বলে, শুধু ভাত কাপড় দিলেই দায়িত্ব পালন হয়ে যায় না!
জাবেদ বড় স্ত্রীর প্রতি রাগ করে বলে, তুই আমার ছোট বউকে নানা কথা বলে, ওর মন নষ্ট করে দিয়েছিস। তোকে সংসার থেকে বিদায় করব। লায়লা স্বামীর কথা শুনে আতঙ্কিত হয়। সে আর ভয়ে কোন কথা বলে না।
দোলা বাবা-মার কথা স্মরণ করে অভিমানে বলে, তোমরা তো তোমাদের মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে এই বিয়ে দিয়েছ। তোমাদের মেয়ে কতটা সুখে আছে তাতো তোমরা জানো না। আর আমার কোন কিছু জানাবোও না তোমাদেরকে। দেখি কতটাই বা সহ্য করতে পারি। এ জ্বালায় জ্বলে নিরবে আঙ্গার হব।

বড় বউ লায়লা মনে একটু দয়া মায়া বেশী। বলে,  দোলা তোর প্রতি আমার কোন রাগ নাই। কারণ তোকে যদি আমার স্বামী বিয়ে করে না আনতো তাহলে কি তুই এই বাড়ি আসতে পারতি? না, পারতি না। তবে আমার ভয় হয় তোকে নিয়ে। আমি যে জ্বালা সহ্য করতে পারছি। তুই কি তা পারবি সইতে? তোর এই ছোট বয়সে!
আপা তুমি কি এমন জ্বালা সহ্য করেছ যা আমার সইতে হবে?
সময়মত নিজের চোখেই সব দেখতে পারবি।
একদিন আহাদ আহমেদ আসে মেয়ে দোলাকে দেখতে। দেখে জাবেদের আগে বিয়ে আছে। চমকে যায় সে। জাবেদের সঙ্গে রাগারাগি করে। তোমায় বিয়ে আছে আমাদের জানাওনি কেন?
নিজের আগে বিয়ে আছে নিজেই ঢাকঢোল পিটাবো নাকি? ছেলেদের আগে একটা বিয়ে কিংবা পাঁচটা বিয়ে তাতে কিবা আসে যায়? দেখেন, আপনার মেয়েকে সবকিছু দিয়ে পরিপূর্ণ রেখেছি কিনা।
আমার মেয়েকে দিয়ে দোজবর পুরুষের সংসার করাবো না।
আপনার মেয়েকে যদি নিয়ে যেতে চান তাহলে নিয়ে যান।
হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তাই করবো। তবুও তোমার সংসার করাবো না আমার মেয়েকে ‍দিয়ে।
জাবেদ বিয়ে করে অতি আগ্রহ নিয়ে। বিয়ের পর স্ত্রীর প্রতি তার আগ্রহ থাকে না। ইচ্ছে করলে সে সংসার করতে পারে না হয় সে চলেও যেতে পারে।  আহাদ আহমেদ মেয়েকে বলে, মা চল, তোর আর সতীনের ঘর করতে হবে না।
দোলার কঠিন উত্তর, না বাবা, আমি যাব না। আর তোমরা তো ভালো ছেলে পেয়ে তার সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছ। ছেলের বয়স একটু বেশি তাতে কি হয়েছে? ছেলের টাকা আছে, মেয়েকে সুখে শান্তিতে রাখতে পারবে। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি তাতে কি!
মারে আমি তোর অভিমানের কথা বুঝি।
যাক বাবা তুমি এ নিয়ে কোন আফসোস করোনা। বাবা তুমি এখানে এসে যা দেখছো সবই আমি মেনে নিয়েছি। আর আমার সতীনের কথা বলছো? সে তো আমাকে কোন জ্বালাতন করে না। বাবা আমার বরাতে যা লেখা ছিল তাই হয়েছে। তুমি এনিয়ে ভেবোনা।
মা এমন সংসার তোর করতে হবে না, তুই চল আমার সঙ্গে। এছাড়া আমি আর কোনো পথ দেখছি না।
বাবা এখানে আমি অনেক ভালো আছি।
কেমন ভালো আছিস তাতো দেখতেই পাচ্ছি।
বাবা আমার জন্যে যখন যা করা দরকার ছিল তখন তা করোনি। এখন এ নিয়ে আর ভাবার দরকার নেই।
যাক মা তুই থাক।

জাবেদ থাকে মেয়ে মানুষ নিয়ে। ঘরে স্ত্রীদের প্রতি তার কোন লক্ষ নেই। দোলা দেখে তার স্বামী চোখের সামনে অন্য মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তি করে।
দোলা স্বামীকে বলে, আপনি যদি অন্য মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তি করবেন, তাহলে বিয়ে করছিলে কেন?
কেন? সেই কৈফিয়ত কি তোকে দিতে হবে? আমার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।  হয় সংসার কর না হয় চলে যা।
বিয়ে করার সমায় বিয়ে করবেন আর স্ত্রী হিসাবে কিছু বললে, আধিকার হারাবার কথা বলবেন। ভালোই আপনার মন মানসিকতা।
ভাষণ ছাড়িস না। এসব আমার ভালো লাগেনা।
দোলা স্বামীর এমন কথা শুনে নিরবে কান্নাকাটি করা ছাড়া কিছুই করার তার থাকেনা।
লায়লা বলে কান্নাকাটি করিস কেন? এই অল্পতেই এমন! দিন দিন আরো কত কি দেখবি! এসব যন্ত্রনা সামলিয়ে নে। আর তাকে তার মত থাকতে দে। যে তোকে অবহেলা করে? তার কাছে তুই আদরের পাত্রী হতে যাবে কেন? ছুড়ে ফেল তাকে হৃদয় থেকে!
দোলা আশ্চর্য! আপা তুমি যন্ত্রনা সহ্য করতে করতে এখন তুমি যন্ত্রনা সইয়ে গেছো।
তুইও চেষ্টা করলে পারবি। এই আমাকে দেখ। এসব ব্যাপারে এখন আমার কিচ্ছু আসে যায় না।

দোলার একটি পুত্র সন্তান হয়। এদিকে মাত্রাতিরিক্ত বিলাসী জীবনের হঠাৎ করে জাবেদ মারা যায়। দোলা আর লায়লা মিলে স্বামীর ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করে।
লায়লার ভাই আসিব আসে বোনের বাড়ি বেড়াতে। আসার কদিন পর আসিব দোলাকে বলে, আমি তোমাকে একটি কথা বলতে চাই?
জী ভাইয়া বলেন?
এত ভাইয়া ভাইয়া বলোনা তো! আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই?
আপনি এসব কি বলছেন? আমি আপনার বোন হই!
তুমি তো আমার মায়ের পেটে বোন নয়!
আপনার এসব কথা আমি আপাকে জানাবো।
যাও বলে দাও? তাতে আমার কিছু আসে যায় না! তবে আমি তোমাকে বিয়ে করেই ছাড়বো।
আসিবের প্রস্তাবে দোলা রাজি না হওয়ায়। আসিব এলাকায় দোলার নামে মিথ্যা বদনাম ছাড়ায়।
লায়লা বলে দোলাকে, আমার ভাই তোকে এরকম জ্বালাতন করছে, তুমি আমাকে বলিস নি কেন?
আপা সম্মানের দিকে তাকিয়ে, তাই বলিনি।
এখন সে তোর সম্মান রেখেছে? দাঁড়া আমার ভাই হয়েছে তাতে কি! আমিও ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নই। হায়রে নারী লোভী পুরুষ নিজের চাওয়ার কাছে দিকবিদিক নেই!
আসিব পিছু ছাড়ে না দোলার। দোলাকে জ্বালাতনের মাত্রা বেদম পর্যায় যায়। আসিব দোলাকে দেখলেই জড়িয়ে ধরে। বিষয়টি লায়লা চোখে পড়ে।
লায়লা বলে আসিবকে, তুই আমার ভাই ঠিকই, এমন ভাইয়ের বোন হতে চাই না আমি। আমার বাড়ি থেকে তুই বেরিয়ে যায়।
আসিব দোলার হাত ধরে বলে, তুমি চলো আমার সঙ্গে।
দোলা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে লায়লার পাশে যেয়ে দাঁড়ায়। লায়লা বলে আসিবকে,  তুই আর এক মুহূর্ত আমার বাড়িতে দাঁড়াবি না। আসিব চলে যায়। লায়লা এর উপায় খুঁজে। লায়লা প্রতিবেশী সুমনের সঙ্গে দোলার বিয়ে ঠিক করে। দোলা তাতে রাজি হয়না। লায়লা বলে দোলাকে, তোর ছেলে দিপুকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবি। একবার ভেবে দেখ। সুমনের টাকা-পয়সা নেই। কিন্তু সে ছেলে ভালো। তোর ভাগের সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকায় সুমনকে বিদেশ পাঠাবি। সুখে শান্তিতে সংসার করবি। স্বামি থাকলে কোনো পুরুষ তোকে জ্বালাতন করবে না।
সুমন সবকিছু জেনেই দোলাকে বিয়ে করতে রাজি হয়। সুমন বলে, দিপুকে আমি নিজের সন্তানের মত লালন পালন করব। দিপুকে মেনে নেওয়ায় দোলা ভীষণ খুশি। দোলা নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে সুমনের কাছে সমস্ত টাকা-পয়সা দেয়। সেই টাকা দিয়ে সুমন বিদেশ যায়। বিদেশ যাওয়ার পর আস্তে আস্তে সুমন পাল্টে যেতে থাকে। সুমন এক সময় দোলাকে বলে, তুমি আমাকে যে টাকা দিয়েছ আমি তোমাকে সে টাকা দিয়ে দেবো।
দোলার সহজ সরল উত্তর। টাকা তোমার কাছে রাখো। আমি টাকা ‍দিয়ে কি করবো। টাকা-পয়সা আমার বোঝা মনে হয়।
কিন্তু আমার যে ভাল লাগেনা তোমাকে। আর আমি চাই তুমি আমার বাড়ি থেকে চলে যাও।
তুমি এসব কি বলছো? আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।
বোঝা অতি সহজ। তুমি অন্যের বাচ্চার মা। তোমাকে আমার নিজের মনে হয় না। আমি চাই না তোমাকে নিয়ে সংসার করতে।
তুমি তো আমার সব জেনেশুনেই বিয়ে করেছ?
তখন আমার যেমন দিন ছিল। তখনকার দিন আর এখনকার দিন এক নয়। তখনকার দিন আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে, আমার বর্তমান অবস্থানে কথা। দোলা রুখে দাঁড়াতে চেষ্টা করে।
আমার বাড়ি থেকে যদি না যাও। তুমি তো তোমার সন্তানকে ভালোবাসো। সময় থাকতে ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাও।
আমার সন্তানকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে, টাকা দিয়ে বিদায় করতে চাও!
টাকাই বা তোমাকে কে দিবে! টাকা যার হাতে যায় টাকা তার কথা বলে।
সুমনের সংসার থেকে দোলা ছেলেকে নিয়ে শূন্য হাতে বেরিয়ে যায়।
লায়লা বলে দোলাকে, তোর টাকায় সুমনের আজ এই অবস্থা। আর সে তোকে পথে ছুড়ে মারল। এত বড় জালিয়াতি। আমি সুমনের সঙ্গে কথা বলব।
আপা যার কপালে সুখ নেই। চাইলেই তাকে সুখ দেওয়া যায় না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমার সন্তান। আমি আমার সন্তানকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। আমি কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে, আমি নিজেই পরিশ্রম করে স্বাবলম্বী হতে চাই। পুনরাবৃত্তি এবং প্রতারণায় পূর্ণ নারী জীবনের মাঝে দোলা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে। অপেক্ষা করে জীবনে নতুন সূর্যোদয়ের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
Theme Created By ThemesDealer.Com