বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১, ০৬:২৭ পূর্বাহ্ন
Logo
নোটিস :
আমাদের সাইট-এ প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে,যোগাযোগ করুন>> 01712-129297>>>01712-613199>>>01926-659742>>>

স্মৃতি অম্লান – সুলেখা আক্তার শান্তা

সুলেখা আক্তার শান্তাঃ / ১৫১ বার
আপডেটে : মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০২১

স্মৃতি অম্লান

ভোরের শীতল হাওয়া বইছে। চোখে মুখে তার পরশ, বেশ ভালো লাগছে আমার। আকাশ লাল করে সূর্য উঠছে। চারিদিকে মনোরম পরিবেশ। লোকজনের তেমন একটা সমাগম নেই। আমার ছোট্ট শখের বাগানে কাজে লেগে পড়ি। কয়েকটা গাছে ফুল ফুটেছে। মৃদু বাতাসে দুলে দুলে তারা যেন ইশায়া আমায় ডাকছে। কয়েকটা ফুল তুলে পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখি। পড়া শেষ হলে, নিজের কিছু কাজ সেরে রওনা দেই স্কুলে। আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। শৈশবের আঙিনায় তখন কৈশোরের উঁকিঝুঁকি। স্কুলে সহপাঠীদের মধ্যে কেউ বন্ধু বা প্রাণের সখা হবে এমন চেতনা জাগেনি। রিতা আমার সঙ্গে নিজে থেকেই ভাব জমায়। কয়েকদিনেই আমরা বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠি। শৈশবের নিঃসঙ্গতায় কেমন যেন এক পূর্ণতা আসে। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় তিন মাইল দূর। তার মাঝ পথে রিতাদের বাড়ি। রিতা সঙ্গে ওর এক ফুপু আসমাও স্কুলে আসে, সে ক্লাস নাইনে পড়ে। সে আমাদের দু’জনকে খুবই স্নেহ করে। অনেক উৎসাহ নিয়ে আমরা ক্লাস করি। কিছুদিন যেতেই রিতার স্কুলে আসা অনিয়মিত হয়। রিতাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, আমার স্কুলে যেতে ভালো লাগেনা। ওর এই কথায় আমার মন খুব খারাপ হয়। মনের কথা প্রকাশের মত ভাষার গঠন তৈরি তখন হয়নি। রিতার অনুপস্থিতির বেদনা মনেই লুকিয়ে রাখি ওকে বলতে পারি না। একসাথে যাওয়া আসার নিত্য সঙ্গী রিতা আমার স্কুল জীবনের আনন্দকে পূর্ণ করেছিল। তারপরও আমি চাই রিতা স্কুলে নিয়মিত আসুক। রিতা আমার অনুরোধে মাঝে মাঝে স্কুলে না এসে পারেনা। এর মাঝেই রিতার বিয়ে ঠিক হয়। এখানেই সমাপ্তি ঘটে রিতার স্কুল জীবন। এমন আকস্মিক অভিজ্ঞতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। কিন্তু আমি রিতার মায়া ছাড়তে পারি না। বিয়ে হলেও রিতা বাবার বাড়িতেই থাকে, মাঝে মাঝে শ্বশুর বাড়ি যায়। একদিকে ও ছোট আরেকদিকে ওর বাবার বাড়ির প্রতি টান। ওর নিয়মিত শ্বশুরবাড়ি থাকা হয়না। রিতাদের বাড়ীতে অনেক ফুল গাছ। রিতা আমার অনুভূতি বোঝে, ফুল আমি ভীষণ পছন্দ করি। রিতা নিজে থেকেই আমাকে ফুল তুলে দেয়। ও এমন আমাকে প্রায়ই ফুল তুলে দিত।

রিতাদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির যাবার পথে একদিন দেখি একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে ভীষণ সুন্দর। মনে তখনও প্রেমের অনুভূতে দোলা সৃষ্টি না হলেও সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য বুঝি।
ছেলেটি আমাকে বলে, তোমার ফুলগুলো আমাকে দিবে? তার মুখে ছিল চোখে পড়ার মতো অপূর্ব হাসি।
আমার সহজ উত্তর, না, আমি ফুল দিব না।
একটা ফুল অন্ততপক্ষে আমাকে দাও।
আমার একই কথা না, দেব না। মনে তেমন ভয় না লাগলেও এটুকু বুঝতে পারি এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া ভালো। সে আমার নাম জিজ্ঞাস করেনি, আমিও আর কোন কথা বলার অবকাশ পায়নি। এরপর দ্রুতপায়ে বাড়ি চলে আসি। কিন্তু আমার চোখে ভাসতে থাকে ছেলেটির হাসি। পরদিন দেখি ছেলেটি যেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। এক অজানা আকর্ষণে সেদিকে তাকাই।    দু’দিন এভাবে কাটে। কয়েকদিন পর আমি রিতাদের বাড়ি থেকে ফুল নিয়ে ফিরছিলাম। ছেলেটি দেখি সেখানেই দাঁড়িয়ে। আমার হাতে ফুল দেখে বলে, আজ আমাকে ফুল দিবে না।
আমি মাথা নেড়ে না বলে, পথ চলি। আমি পিছন ফিরে দেখি ছেলেটি হাসি মাখা মুখে আমার গমন পথের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
রিতার পরে ক্লাসে আমার বেশ কয়েকজন বান্ধবী হয়। রোকসানা, মনি, নার্গিস, রিমা, ফাহিমা, সোনালী। ক্লাসে অন্যদের চেয়ে আমি চুপচাপ থাকায় শিক্ষকরা আমাকে বেশ স্নেহ করেন। হঠাৎ আমাদের ক্লাসে বিলকিসের আগমন ঘটে। ক্লাস চলার তিন মাসের মাথায়। বিলকিস খুব সুন্দরী। আমাদের সহপাঠীদের চেয়ে বিলকিসের বয়স একটু বেশি। তার পোশাক-আশাক বেশ আকর্ষণীয়। স্কুল ড্রেস পড়ে না এলেও সে ক্লাসে নিয়মিত ছিল। বিলকিস নিজে থেকেই আমার সঙ্গে আলাপ করে। ক্লাসে আমাকে ছাড়া ও কার সঙ্গে বসে না। বলে, শিখা তুমি আমাকে ছাড়া অন্যেদের সঙ্গে বসবে না। বসলেও সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসে। এমন জোর করে বন্ধুত্ব আমি বেশ উপভোগ করি।
বিলকিস বলে, শিখা তোমাকে আমি দুটো গান লিখে দেবো। গানের সুর আর কথা তখন অর্থপূর্ণ হতে শুরু করেছে মনে। আমি উৎসাহ নিয়ে বলি, তুমি আমাকে গান লিখে দেবে? ও আমাকে দুটো গান লিখে দেয়। একটি ‘জীবন ও আঁধারে পেয়েছি তোমারে’ আরেকটি ‘তুমি আমায় কত চেনা সেকি জানোনা’। বিলকিস আমার গালে টোকা দিয়ে বলে, নাও এবার খুশি তো? আমি মাথা নেড়ে, হ্যাঁ বলি। অহিদ ক্লাসের মধ্যে ছিল বেশ চঞ্চল। কিন্তু আমি ছিলাম নিরব গম্ভীর টাইপের। অহিদ আমাকে হাসানোর জন্য বেশ চেষ্টা করতো। অহিদ স্কুল ছুটি হওয়ার পর আমার জন্য অপেক্ষা করে। নার্গিস, রিমা, সোনালী, অহিদের সঙ্গে খুব দুষ্টামি করে। আর অহিদ চায় আমি যেন ওর সাথে কথা বলি, দুষ্টামি করি। অহিদ হেসে হেসে কথা বলা বেশ উপভোগ্য ছিল। ও স্কুল থেকে ফেরার পথে খুব দুষ্টুমি করত। বাড়িতে ফেরার পথে একসঙ্গে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত আসি। ওইখান থেকে ভাগ হয়ে যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেই।
ক্লাস সেভেনে আমি অন্য স্কুলে ভর্তি হই। জীবনে শুরু হয় আরেক পর্ব। পুরনো সহপাঠীদের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়না। জানিনা এখন কে কোথায় আছে, কেমন আছে। স্কুল সহপাঠীদের ভীষণ ভীষণ মনে পড়ে, হয়তো আর দেখা হবে না। এমনও হতে পারে কারো সঙ্গে হয়তো দেখা হয়েছে, কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারিনি। আর আমিও জানিনা তোমাদের আমার কথা মনে আছে কিনা। সেই ছোটবেলার সাথীদের এখনো খুব মনে পড়ে। যেখানেই থাকো তোমরা ভালো থেকো। তোমরা আমার স্মৃতির মণিকোঠায় অম্লান হয়ে আছো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
Theme Created By ThemesDealer.Com