মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০৮:০২ অপরাহ্ন
Logo
শিরোনাম :
নবীগঞ্জে প্রতারক নোমানের হাত থেকে বাঁচাতে ছেলের সংবাদ সম্মেলন দৈনিক গণমুক্তির ৪৮ বছর উদযাপন ও সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা সম্পন্ন র‌্যাবের সাড়াশি অভিযানে ৭৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট সহ ০১ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার নবীগঞ্জে এক ছাত্রী কে বাসে শ্লীলতাহানির চেষ্টা আদমদীঘিতে সুইট লাইফ কফি হাউজে র‌্যাবের অভিযানে পাঁচ জুয়াড়ি গ্রেফতার। মাদারীপুর পরীক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মানববন্ধন দেশে অবহেলিত আলীয়া মাদ্রাসা —মহাসচিব শাব্বীর আহমেদ নন্দীগ্রামে পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের দায়িত্ব গ্রহণ জকিগঞ্জে একটি রাস্তার জন্য চরম দুর্ভোগে স্থানীয়রা – অবশেষে স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কাজ সম্পন্ন রুদ্ধ কপাট – সুলেখা আক্তার শান্তা
নোটিস :
আমাদের সাইট-এ প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে,যোগাযোগ করুন>> 01712-129297>>>01712-613199>>>01926-659742>>>

সুখের ঠিকানা নেই জানা

সুলেখা আক্তার শান্তা: / ১১৫ বার
আপডেটে : রবিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২১

সুখের ঠিকানা নেই জানা – সুলেখা আক্তার শান্তা

এক ছেলে এক মেয়ে রেখে জাহানারা স্বামী অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সন্তানদের নিয়ে চোখে দেখে অন্ধকার সে। জাহানারা মা লতিফা আসে তাকে নেওয়ার জন্য। ভাবে মেয়ে অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে, মেয়েকে নিয়ে বিয়ে-শাদী দিবে।
জাহানারা বলে, মা তোমার সন্তান নিয়ে তুমি ভাবছো আমার সন্তান নিয়ে ভাববে কে? বিয়ে জীবনে একবারই হয় আমারও তা হয়েছে। আমার জীবন মরণ সজলের বাবার এখানেই কাটাতে চাই।
মারে আমি তোর ভালোর জন্যই বলছি। বাকি জীবন ছেলে মেয়ে নিয়ে তুই কিভাবে একা পাড়ি দিবি। একবার ভেবে দেখ।
কপালে যা লেখা আছে তাই তো হবে! এর বাইরে তোর কিছু না।
তুই যা ভালো মনে করিস তাই কর। এরপর লতিফা নিজের ইচ্ছার সঙ্গে মেয়ের মত না মিলাতে পেরে চলে যায় সে।
শুরু হয় জাহানার জীবন সংগ্রাম। ছেলে মেয়ে মানুষ করতে হবে। কিভাবে সংসার চলবে তা নিয়ে তার ভাবনা।
রাহেলা বলে জাহানারাকে, বুবু তোমার কিছু লাগলে বলো।
জাহানারা স্বাধীনচেতা তার এক কথা। আমি কারো কাছে হাত পাততে চাইনা। স্বামীর জায়গা-জমি যেটুকু আছে তাই নিয়ে চলতে চেষ্টা করবো, কারো মুখাপেক্ষী হব না।
বুবু তুমি যদি নিজে ক্ষমতায় চলতে পারো তা তো বেশ ভালো কথা।
জাহানারা অনেক ভেবে এক উপায় বের করে। একটু জমি বিক্রি করে সে আখের রস তৈরীর একটি মেশিন কিনে। কিছু টাকা দিয়ে একটা দোকান নেয়। তার গেন্ডারির রসের ব্যবসা জমে ওঠে। একসময় সংসার চালানোর মতো আয় হতে থাকে। জাহানার নিজের রোজগারে চলতে থাকে দিন।

আরো পড়ুনঃ  বিদীর্ণ বিলাপ – সুলেখা আক্তার শান্তারূঢ় প্রতিদান – সুলেখা আক্তার শান্তা 

রাহেলা বলে, বুবু তোমার বুদ্ধি আর পরিশ্রমের কারণে ছেলে মেয়ে নিয়ে তুমি ভালোভাবেই চলতে পারছো। কারো কাছে তোমার হাত পাততে হয়না।
হাত পাতায় অনেক যাতনা। শক্তি থাকতে কেউ যেন কারো কাছে হাত না পাতে। নিজে কাজ নিজে করে খাওয়ার মধ্যে একটা সুখ আছে। জাহানারা শক্ত হাতে সংসার সামলায়।

জাহানারা ছেলে মেয়ে বড় হয়। মেয়ে নাদিয়াকে ভাল পাত্র পেয়ে বিয়ে দেয়। জাহানার টাকা পয়সায় অত সচ্ছল না থাকলেও ঘরে সুখের অভাব নেই। সজল একদিন বলে, মা তুমি এখন তোমার কাজ বাদ দাও। আমি তো বড় হয়েছি সংসারের দায়িত্ব আমাকে বুঝে নিতে দাও।
আমার পাগল ছেলে বলে কি! বাবা আমার কাজ ছাড়া ভালো লাগেনা।
তুমি আর কাজ করতে পারবে না। আমার পড়ালেখা শেষ। তোমাকে এখন আমি আর কাজ করতে দিব না। ছেলের মমত্ববোধে মায়ের মন আপ্লুত হয়।
সজল ভালোবাসে আঁখিকে। রূপসী আঁখি বড় লোকের অহংকারী মেয়ে। আঁখি রাখ ঢাক না করেই বলে, আমি বংশীয় ঘরের মেয়ে। তুমি তো আমার মতো বংশের না। আমার সঙ্গে তোমার বেমানান।
দেখো কোন কিছু ওজন করে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসার কাছে কোন কিছু বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
সে আমি বুঝি। কিন্তু তোমার মা যে বাজারে গেন্ডারি রস বিক্রি করে। আমার বাবা-মা তোমার কাছে আমাকে বিয়ে দিবেনা! তাদের একটা সম্মান আছে না।
তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা তা বলো?
ভালো তো বাসি। তোমার আমার মাঝে যত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তো তোমার মা!
ভালোবাসো আবার তার মাঝে বাধাও খুঁজতে থাকো!
তোমার অত যুক্তি আমাকে দেখাতে হবে না। তুমি বিয়ের প্রস্তাব পাঠাও।
সজল বাড়িতে এসে চিৎকার করে মাকে ডাকে। জাহানারা কলসি কাঁখে নিয়ে এসে বলে, কিরে বাবা এত ডাকছিস? পুকুরে পানি আনতে গিয়েছিলাম।
সজল উঁচু কন্ঠে বলে, মা তুমি যদি বাজারে গেন্ডারি বিক্রি না করতে, আজ আমার এত সম্মানহানি হতে হতো না।
আমার কাজে তোর সম্মানহানি হয়েছে?
আঁখি আমার ভালোবাসার মানুষ।ও হচ্ছে বড় ঘরের মেয়ে। তোমাকে নিয়ে ওদের সম্মান হানি হচ্ছে।
যে তোর মা কে ছোট করে দেখে, সে তোর ভালোবাসার মানুষ হয় কি করে রে বাবা? আমি কাজ করে তোদের খাওয়াইছি। চুরি করে নয়! আমার এই কাজে তোদের সম্মানহানি হয়েছে?
মায়ের কথায় শান্ত হয়ে সজল বলে, মা তুমি আমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আঁখিদের বাড়ি যাবে।
যেখানে আমাকে নিয়ে তাদের মাথা ব্যাথা। সেখানে আমি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে কি তারা মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হবে?
মা তুমি এত কথা বলো না তো। তোমাকে যা বলছি তুমি তাই করো।
জাহানারা ছেলের কথা মত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। আঁখির বাবা বদরুল উদ্দিন বিত্তের দম্ভে উন্নাসিক। জাহানারার পরনের মলিন কাপড় লক্ষ করে বলে, আত্মীয় হয় সমানে সমান। একবার ভেবে দেখা উচিত ছিল আমার অবস্থানের কথা। জাহানারা এমন কথায় স্তব্ধ হয়ে যায়। তবু ভাবে সন্তানের খুশির জন্য এমন একটু আধটু কথা না হয় শুনলো। বদরুল উদ্দিনের কথা হজম করে নেয় সে। বদরুল উদ্দিন তার উচ্চ অহংকারী কথা বলতেই থাকে। আপনি করতেন বাজারে কাজ। বিভিন্ন পর-পুরুষ দেখেছে আপনাকে। এমন মায়ের ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দেই কি করে?

আপনার মেয়েকে যদি বিয়ে দিতে না চান আমার ছেলের কাছে, দেখেন মেয়েকে আটকিয়ে রাখতে পারেন কিনা।
আমার মেয়েকে আমি ফেরাবো। অহমিকায় আঘাত লাগে বদরুল উদ্দিনের। জাহানারা চলে যেতে নেয়। বদরুল উদ্দিন পিছন থেকে বলে, এসেছেন যখন একটু নাস্তা মুখে দিয়ে যান।
খাবারগুলি তুলে রাখেন। আপনার মত যে বড়লোক আসবে তাকে নাস্তাগুলো দিবেন।
বদরুল উদ্দিনও কমে ছাড়ে না। আঁখিকে ডেকে বলে, এই নাস্তা গুলি তুলে রাখ, সবার জন্য সবকিছু নয়।
জাহানারা বাড়ি আসে। সজল মাকে কাছে পেয়ে, উৎসাহ হয়ে, মা বিয়ের তারিখ ঠিক করে এসেছো?
বাবা তাদের মত বড়লোক আমাদের মত গরীবের কাছে মেয়ে বিয়ে দেয় কি করে?
মা অন্য কোন কারন নয়। কারণ হচ্ছে তুমি। তুমি যদি বাজারে গেন্ডারি বিক্রির কাজ না করতে তাহলে কোন সমস্যা হতো না।
বাবা আমার পরিচয় বাদ দিয়ে, তুই তোর পরিচয় বিয়ে কর।
হ্যাঁ, আমি তাই করবো।

সব জল্পনা কল্পনা বাদ দিয়ে অবশেষে বিয়ে হয় সজল আর আঁখির। কোন বিরাম নেই। বংশীয় ঘরের মেয়ে বলে কথায় কথায় শাশুড়িকে খোঁটা দেয়। পদে পদে তার মান মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি বাবার বাড়ি কোন কাজকর্ম করেনি এখানেও কোন কাজ করতে পারবো না।
অতি দুঃখে জাহানারা বলে, বৌমা তুমি তো বংশীয় ঘরের মেয়ে। ঘরের কাজ কর্ম না করে যদি মান-সম্মান বাঁচে তাহলে তোমার কোন কাজ করতে হবে না। তোমার মর্যাদা তো বাড়বে বুড়ো শাশুড়িকে দিয়ে কাজ করালে।
আঁখি ঝামটা মেরে, কথা না বাড়ানো টাই ভালো আমি হচ্ছি বংশীয় ঘরের মেয়ে। আঁখির কথাই কথাই ছিল এই কথা বলা।

সজল অসুস্থ হয়ে পড়ে, দিন দিন শরীর খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডাক্তারের কাছে জানতে পারে তার ক্যান্সার হয়েছে। চিকিৎসার অনেক খরচ। জমি বিক্রি করে তার চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু সজলের শরীরের কোন উন্নতি দেখা যায় না। চিকিৎসার চালাতে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে তারা। এক পর্যায়ে সজলের আর চিকিৎসা করাতে পারে না।
সজলের ওই পারের ডাক এসে যায়। চলে যায় সে পরপারে। জাহানারার অল্প বয়সে বিধবা, চোখের সামনে একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়। শোকে দুঃখে সে পাথর হয়ে যায়। সংসার চালানোর ভার আবার তাকে নিতে হয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। আবার তাকে নির্ভর করতে হয় সেই গেন্ডারি রসে ব্যবসার উপর। আঁখি শাশুড়িকে যে কাজ নিয়ে উঠতে-বসতে খোঁচা মারতো সেটি সংসারের বড় অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।
আজ সেই কাজ দিয়ে তাদের সংসার চলে। আঁখি শাশুড়িকে ধরে কাঁদে। আপনি আজ কাজ না করলে আমাদের সংসার চলতো না। আমার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে পারতাম না।
আমার লক্ষী বউমা কাঁদে কেন। আমার ছেলের অস্তিত্বের সম্পদ এইযে আমার নাতি নাতনি। এরাই তো আমার ভরসা, বাঁচে থাকার স্বপ্ন।

জাহানারার বয়স হয়েছে শরীর চলেনা। এখন তাঁর শরীরে শক্তি নেই কাজ করার মত। যেই জাহানার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আঁখির কাছে তার শাশুড়ি বোঝা হয়ে যায়। সর্বক্ষণ শাশুড়ির সঙ্গে চেঁচামেচি করে। বলে, এখানে না থেকে মেয়ের কাছে চলে যান।
বৌমা তুমি এসব কথা কি বলো? মেয়ের কাছে থাকবো মানুষ কি তা ভালো চোখে দেখবে!
সংসার চলে না আবার ভালো-মন্দ। সংসারে এমন কিছু অবশিষ্ট নেই যে তা দিয়ে সংসারের হাড়ি চলবে।
আমি আমার স্বামীর বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবো না। আর আমি মরলে আমার স্বামীর বাড়িতেই মরতে চাই। তুমি আমাকে তিন বেলা খেতে না দিতে পারো একবেলা দিও তাতেই আমার চলবে। তাও আমাকে এখান থেকে যেতে বলোনা।
ভাগ্যিস আমার বাবা সংসার চালানোর জন্য কিছু দেয় না হয় কি যে উপায় হত!
আঁখি তার ভাইয়ের শালার আজিজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। লোকজন তা নিয়ে অনেক কথা বলে।
জাহানারা ছেলের বউকে বলে, বৌমা তুমি এসব কি শুরু করেছো? আমার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। আমিতো মরিনি। আমি তো বেঁচে আছি। আমার সামনে এসব চলবে না।
বুড়ি বলে কি? না সহ্য করতে পারলে এখান থেকে চলে যান।
রাহেলা বুবু আমি তোমার দুঃখ আর সইতে পারছি না। তার চেয়ে তুমি তোমার মেয়ে নাদিয়ার কাছে চলে যাও।
নারে রাহেলা আমি এখান থেকে কোথাও যাবো না। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমি স্বামীর বাড়িতেই থাকতে চাই।
হায়রে স্বামী স্বামী করে আর কত কষ্ট সইবা?
ভাগ্যে যদি দুঃখ থাকে সুখ দিবে কে? এর মধ্যে নাদিয়া এসে হাজির। মা তোমার সব কথা রাহেলা চাচী আমাকে ফোনে জানিয়েছে। তোমার এক সন্তানের মৃত্যু হয়েছে আরেক সন্তান তো বেঁচে আছে। তুমি আমার সঙ্গে যাবে।
আমি স্বামীর বাড়ি রাখে মেয়ের বাড়ি যাবো? তাতে তো আমার মন সুখ পাবেনা! তুই এসেছিস দুদিন থেকে যা।
আঁখি গজগজ করে, মেয়েকে রাখবে খাওয়াবে কি। সংসার চলে না তার মধ্যে রাখতে চায় মেয়েকে।
নাদিয়া বলে, আমি থাকতে আসিনি, এসেছি মাকে তুমি কি সুখে রেখেছে তা দেখতে।
আঁখি আমি তো সুখ দিতে পারিনি, তাহলে মাকে এখানে রাখছো কেন? নিয়ে যাও তোমার কাছে।
নাদিয়া মায়ের দুঃখ মোচনে কান্নাকাটি ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। মাকে বলে, থাকো তুমি তোমার স্বামীর বাড়ি। আমি চলে যাচ্ছি।

আজিজ বিয়ে করে আঁখিকে। আজিজ বিয়ে করে তার বাড়িতে নেয়না আঁখিকে। কারণ সে বড় বউয়ের অজান্তে বিয়ে করেছে। সজলের বাড়িতেই আঁখিকে থাকতে হয়। জাহানারা যখন ছেলের জায়গায় আজিজকে দেখে দুঃখে তাঁর বুক ফেটে যায়। ছেলের কথা মনে পড়ে তাঁর বার বার। মনে পড়ে তাঁর সংসার গুছিয়ে রাখা নিদারুণ সংগ্রামের কথা। আজ কেমন এলোমেলো হয়ে গেল সব। সে ভাবতে থাকে এই পুরীতে তাঁর “সুখের ঠিকানা নেই জানা”। দুনিয়ার সব সুখ দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর কাছে। স্বামী আর ছেলের কাছে চলে যেতে চায় সে।

Advertising

Advertising


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
Theme Created By ThemesDealer.Com