মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন
Logo
শিরোনাম :
কুশিয়ারা’র ২৪ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সাংবাদিক এম. এ ওয়াহিদ চৌধুরীকে সম্মাননা প্রদান মণিরামপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ভাইকে পিটিয়ে জখম করে টাকা কেড়ে নেয়ার অভিযোগ নন্দীগ্রামে ৯টি ডাকাতি মামলার আসামি গ্রেফতার সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থেকে এক কিশোরী নিখোঁজ সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর নির্মাণাধীন মার্কেট গুড়িয়ে দিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত বাঘ আটক করেছে মেঘনা’র জনতা! টাইমস্কেলসহ সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখার দাবিতে মাদারীপুরে শিক্ষকদের মানববন্ধন সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব’র নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দকে মেট্রোপলিটন পুলিশে’র পক্ষ থেকে অভিনন্দন আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুবার্ষিকীতে সিলেটে স্বেচ্ছাসেবকদলের দোয়া মাহফিল বিনিময় – হাসনাহেনা রানু
নোটিস :
আমাদের সাইট-এ প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে,যোগাযোগ করুন>> 01712-129297>>>01712-613199>>>01926-659742>>>

ছেলে মেজর (অব.) সিনহাকে নিয়ে যা বললেন মা নাসিমা আখতার

স্টাফ রিপোর্টার: / ৯৮ বার
আপডেটে : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার:: আমার ছেলে বাস্তবের একজন নায়ক ছিল। সে সাহসের সাথে মৃত্যুকে বরণ করেছে। সে কোনো কাপুরুষ ছিলো না। একজন জাতীয় বীর ছিল। সে ছিল একজন সত্যিকারের প্রেরণাদাতা। আমাদের সকল আত্মীয়, সব বন্ধু তার কাছ থেকে জীবনের উৎসাহ পেতো। সে সবসময়ই হাস্যজ্জল এক চমৎকার মানুষ ছিল, যে সবসময়ই মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং অন্যদের সুখী করতে চেষ্টা চালাতো। অপরের সুখের জন্য জীবন উৎসর্গ করাই ছিল তার অন্যতম ব্রত। আমাকে বিন্দুমাত্র জিজ্ঞাসা না করেও আমার সকলে আরামের দিকে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর ছিলো।

চাকরির কারণে তার পোস্টিং যেখানেই হোক না কেন আমি যাতে ভালো থাকি, আরামে থাকি সে নিয়ে তার চেষ্টার অন্ত ছিল না। বাড়ির প্রতিটা কাজে আমাকে সাহায্য করতো। সবকাজ সবসময়ই নিজে নিজেই করে আমাকে সবসময় চমকে দেওয়ার কাজটা সে খুব ভালো পারতো। আমাদের বাড়ির প্রতিটি কোণা, প্রতিটি দেয়াল সে নিজের হাতে সাজিয়েছিল।

তার বাবার মৃত্যুর সময় আমাদের বাড়িটা দুইতলা ছিল। কিন্তু যখন সে এসএসএফে পোস্টিং পেল (তার ১৬ বছরের সামরিক জীবনে যে একটি মাত্র সময়েই সে ঢাকায় পোস্টিং পেয়েছিল)। তখনই সে হাউজ বিল্ডিং থেকে ঋণ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে আমাদের বাড়িটা চারতলা করে। এই নির্মাণ কাজের তদারকি করার জন্য সে অধিকাংশ সময়ই রাতে আসতো। যেহেতু এসএসএফের দায়িত্বে ব্যস্ততা অত্যন্ত বেশি থাকায় এছাড়া সময় পেত না।

আমার ছেলেকে তার কোন ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি আটকে রাখি নাই, কোন সময়েই না। যা যা সে করতে চেয়েছে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি। অবশ্য সে আমাকে সবসময়ই বুঝিয়ে ফেলতে সক্ষম হতো কোন না কোন ভাবে। আমাকে না বুঝিয়ে সে একটা কাজও করেনি। সে সবসময়ই আমার অনুমতি নিয়ে নিত সেই কাজগুলোর জন্য যেগুলো তাকে সুখী করতে পারে। যাতে তার ভালো লাগে। সেই কাজগুলোতে আমার সবসময়ই সায় ছিল।

সে ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। দেশকে যে নিজের চেয়ে বেশী ভালোবাসতো। আমার ছেলে ছিল দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে সমুদ্র ভালোবাসতো। সমুদ্র সৈকতে বই পড়তে পড়তে সময় কাটাতে চাইতো। শৈশব থেকেই আমার ছেলে অ্যাডভেঞ্চারের ভক্ত ছিল। সারা বিশ্ব ভ্রমণের এক প্রগাঢ় সাধ ছিলো তার, যে জন্য বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী থেকে সে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছিল। আমি তাকে নিষেধ করি নাই। তার হিমালয়ে যাবার স্বপ্ন ছিল। ছেলেটা হাইকিং পছন্দ করতো, জাপানে একটা সাইকেল ট্যুরে যেতে চেয়েছিলো। চাকুরি থেকে অবসরের পরপরই সে তার এই স্বপ্নগুলো ছোঁয়ার জন্য প্রস্তত হচ্ছিল।

এর মাঝে করোনা মহামারি চলে এলো। দেশব্যপী লকডাউন শুরু হবার কদিন পরে সে জানালো যে, তাকে নিয়মিতই বাহিরে যাতায়াত করতে হয়, এবং আমি একজন বয়স্ক মানুষ, তাই তার এই চলাফেরা আমার জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এরপর সে বলল যে, রাজশাহী যাবে কিছুদিনের জন্য, সেখানে তার এক বন্ধুর মা (যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন) এক বিশাল লাইব্রেরী করেছেন। ছোট থেকেই সে প্রচুর বই পড়তো। তাই তাকে আমি যেখানে যেতে দিলাম। বললাম প্রচুর পড়াশোনা করতে। সে রাজশাহীতে প্রায় চার মাস ছিল এবং আস্তে আস্তে নিজেকে বিশ্ব ভ্রমণের জন্য প্রস্তত করছিল। আমার ছেলেটার তীব্র ভ্রমণের নেশা ছিল। যখন সে জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশনে ছিল, ছুটিতে বাংলাদেশে আসতো না। তার বদলে দুই মাসের ছুটিতে ইউরোপ যেয়ে গাড়ী করে হাজার হাজার মাইল ড্রাইভ করে নিজে নিজে ঘুরেছিল। এটা আমার খুব ভালো লেগেছিল কারণ ছেলেটা অন্তত নিজের একটা স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিল। আমার পূর্ণ সমর্থন ছিল এই সিদ্ধান্তের প্রতি।

চাকরি থেকে অবসর নেবার পর প্রতি রাতে সে আমার মশারি টাঙ্গিয়ে দিত। আমার সকল ঔষধপত্র নিজে নিজেই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতো, যাতে আমার বুঝতে বিন্দুমাত্র সমস্যা না হয়। যখনই বাড়ির বাহিরে যেত, সবসময়ই নিজের চাবি নিয়ে যেত, যাতে আমাকে বিরক্ত না করতে হয় দরজা খোলার জন্য।

রাজশাহী থেকে ফিরে মাত্র ক’দিন আমার সাথে ছিল। এবং তারপর কক্সবাজারে এক মাসের জন্য থেকে একটা তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা জানালো। আমি সম্মতি দিয়েছিলাম। সে বিয়ে করেনি, আর আমিও তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইনি।

২৬ জুলাই ছিল ওর জন্মদিন। অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে সে যে রিসোর্টে ছিল সেখানে এক বাক্স চকলেট পাঠিয়ে ছিলাম। কোরবানির ঈদের সময় ছেলেটা আমাকে কক্সবাজারে যেয়ে ওর সাথে ঈদ করতে বলছিল, কারণ তথ্যচিত্রের শুটিংয়ে নাকি আরও কয়েকদিন সময়ের দরকার ছিলো। অসুস্থতার কারণে আমার যাওয়া হয়ে উঠেনি।

৩১ জুলাই রাত ১১টায় আমি ছেলেকে ফোন দিয়েছিলাম। কিন্তু ফোন কেউ ধরে নাই। অবশেষে পুলিশ আমাকে ফোন করে আদনানের (মেজর সিনহার ডাকনাম) মৃত্যুসংবাদ দেয়। আমার ছেলে একজন শহীদ। একজন বীরের রক্ত এবং মায়ের অশ্রু বৃথা যেতে পারে না। আশা করি পরম করুণাময় তাকে জান্নাতে আশ্রয় দিবেন। আমিন।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এইচ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
Theme Created By ThemesDealer.Com